যেভাবে সহজে আপনি পুঁইশাক চাষ করবেন
কিভাবে সহজে পুঁইশাক চাষ করবেন জেনে নিন
পুইশাক হচ্ছে এক প্রকারের শাক জাতীয় সবজি । এটি আমরা রান্না করে খায়, ভাজি করে খায় । এটি বিভিন্ন ভাবে খাওয়া যায় । এটি খেতে মোটামুটি ভালোই লাগে । পুঁইশাক খেলে শরীরের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, হজম শক্তি বাড়ে এবং ত্বক ও চোখ ভালো থাকে ।
তবে অতিরিক্ত খেলে ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি রোগ হতে পারে । যাদের কিডনি ও ইউরিক
এসিডের সমস্যা আছে, তাদের জটিলতা বাড়তে পারে । তাই এই সব রোগে যারা ভুগছেন তাদের
পুইশাক না খাওয়াই ভালো ।
পেজ সূচিপত্রঃ পুঁইশাক চাষ করা সম্পর্কে আজ আমরা যা নিয়ে আলোচনা করব তা হল
- পুঁইশাক কি ?
- পুঁইশাক খাওয়ার গুনাগুণ
- পুঁইশাক খাওয়ার ক্ষতিকর দিক
- পুঁইশাক চাষ পদ্ধতি
- জমি তৈরি
- সার প্রয়োগ
- সার প্রয়োগের নিয়মাবলী
- বীজ বপন ও চারা রোপণ
- পরিচর্যা
- পোকামাকড়
- ফসল সংগ্রহ ও ফলন
- উপসংহার
পুঁইশাক কি ?
পুঁইশাক হল এক জাতীয় শাক । এটি আমরা বিভিন্নভাবে তরকারি রান্না করে
খেয়ে থাকি । এই শাক দুই কালারের হয়ে থাকে । একটি হল সবুজ কালার আর একটি হলো
লাল কালার । দুই কালারের শাকই খেতে মজা লাগে । শীতকালে আবারএই পুঁইশাকে মুচরি
ধরে । এই মুচরি খেতেও অনেক মজা লাগে । এই মুচরি ভাজি করে খেতেও অনেক মজা লাগে
।
পুইশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও ফাইবার । যা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা
দূর হয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, হজম শক্তি বৃদ্ধি করে ইত্যাদি । তাই
ভিটামিনের অভাব পূরণ করতে আমরা মাঝে মধ্যে পুঁইশাক খেতে পারি । পুঁইশাক ভাজি
করে খায়, আবার ঝোল জাতীয় তরকারি যেমন মাছ দিয়ে, ডাল দিয়ে ইত্যাদি দিয়ে
রান্না করেও খায় ।
পুঁইশাক খাওয়ার গুনাগুণ
পুঁইশাক খাওয়ার অনেক গুনাগুন বা উপকারিতা রয়েছে । কারণ পুঁইশাকে প্রচুর
পরিমাণ ভিটামিন এবং ফাইবার রয়েছে । যা আমাদের শরীরে ভিটামিনের অভাব দূর করে ।
পুইশাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে । তাই বুঝতেই পারছেন পুইশাক খেলে
একই সঙ্গে কতগুলো পুষ্টি পাওয়া যাবে । তাই আপনারা নিয়মিত বা মাঝে মধ্যে
পুঁইশাক রান্না করে খেতে পারেন ।
পুঁইশাক গ্রীষ্মকালীন একটি সবজি । কিন্তু এখন বর্তমানে সারা বছরই পুঁইশাক
পাওয়া যায় । প্রায় সব জায়গায় এখন পুঁইশাক চাষ করা হয় । তাই এর সকল
পুষ্টিগুণ পেতে চাইলে, আপনি নিয়মিত বা মাঝে মধ্যে পুঁইশাক খেতে পারেন । এটি
আপনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে রান্না করে খেতে পারেন । এটি খেয়ে আপনার শরীরে
ক্যালসিয়াম ও ফাইবারের অভাব দূর করতে পারেন ।
পুঁইশাক খাওয়ার ক্ষতিকর দিক
পুইশাক খাওয়ার অনেক গুনাগুন রয়েছে এবং পুঁইশাক চাষ করা অনেক সহজ । কিন্তু এর
সামান্য কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে । সেগুলো সম্পর্কে জানবো এবং সতর্কভাবে এটি
খাব । অক্সলেট ও পিউরিন থাকায় কিডনিতে পাথর ও ইউরিক অ্যাসিড বা গেঁটেবাত
রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে । অতিরিক্ত আঁশযুক্ত হওয়ায় বেশি খেলে পেট
ফাঁপা বা ডায়রিয়া হতে পারে ।
এটি খেলে যাদের অ্যালার্জি আছে, তাদের এলার্জি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে এবং
হালকা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে । তাই যাদের এই সমস্যাগুলো রয়েছে
তারা পুঁইশাক থেকে দূরে থাকতে পারেন । না হলে দেখা যাচ্ছে সে সমস্যাগুলো বেড়ে
যেতে পারে এবং আপনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন । তাই সুস্থ থাকার জন্য অবশ্যই
এগুলো মেনে চলতে হবে ।
পুঁইশাক চাষ পদ্ধতি
পুইশাক বাংলাদেশের প্রধান গ্রীষ্মকালীন পাতা জাতীয় সবজি । তবে সারা বছর ধরেই
এই সবজি পাওয়া যায় । এতে ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পর্যাপ্ত
পরিমাণে রয়েছে । পুঁইশাক সাধারণত বসতবাড়ির আঙিনার বেড়ায় বা মাচায় জন্মাতে
দেখা যায় । এছাড়াও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চাষ করা হয় । এই পুই শাকের অনেক
চাহিদা রয়েছে । অনেক মানুষ পুঁইশাক প্রচুর খায় এবং অনেক পছন্দ করে ।
গ্রামে সাধারণত অনেক খোলা জায়গা বা পরিত্যক্ত জায়গা থাকে । তাই গ্রামঅঞ্চলে
মাঠে ঘাটে যে কোন জায়গায় গাছ লাগিয়ে দিলে পুঁইশাক সুন্দর চাষ করা হয় ।
কিন্তু শহরে যেহেতু জায়গা নেই, সেহেতু আপনি চাইলে ছাদের উপরে বা বেল্কুনিতে
গাছ লাগিয়ে চাষাবাদ করতে পারেন । এর জন্য আপনাকে তেমন কোন পরিশ্রম করতে হয় না
।
জমি তৈরি
সাধারণত মার্চ-এপ্রিল বা চৈত্র মাস পুঁইশাক লাগানোর উপযুক্ত সময় । তবে সেচের
সুবিধা থাকলে ফাল্গুন মাস হতেই এর চাষ করা যেতে পারে । চারা রোপনের পূর্বে জমি
ভালোভাবে চাষ ও ময় দিয়ে ঝুরঝুরা করে তৈরি করে নিতে হবে । এ সবজি চাষের
জন্য উর্বর বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ মাটি উত্তম । তাই পুঁইশাক চাষ করার
জন্য দোআঁশ মাটি ব্যবহার করতে পারেন ।
গ্রামাঞ্চলে এভাবে জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে ও মই দিয়ে জমি তৈরি করা হয় ।
পুঁইশাক চাষ করার জন্য শহরে যেহেতু ফাঁকা জায়গা নেই, সেহেতু ছাদের উপরে
বালটিতে মাটি ভর্তি করে নিয়ে এসে বালটির মধ্যে আপনি গাছ লাগাতে পারেন । গাছ
যখন বড় হবে তখন আপনি বাহান করে দিলে, সে বাহানে গাছ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে
।
সার প্রয়োগ
আপনি যেকোনো চাষাবাদ করার ক্ষেত্রে অর্থাৎ যে কোন গাছ লাগানোর পর আপনাকে গাছে
নিয়মিত সার প্রয়োগ করতে হবে । সার প্রয়োগ না করলে গাছ বড় হবে না বা
পুষ্টিগুণ পাবে না । তাই গাছের পরিচর্যা হিসেবে আপনাকে গাছে বিভিন্ন ধরনের সার
প্রয়োগ করতে হবে । যাতে করে গাছটি সুন্দরভাবে বড় হয় এবং ফুল ফল দেয়
।
পুঁইশাক চাষে গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা ভালো । এতে মাটির গুনাগুন বজায়
থাকবে ও পরিবেশ রক্ষা হবে । পুঁইশাকের জন্য প্রতি শতকে বা ৪০ বর্গমিটার জমিতে
নিম্নরূপ সার ব্যবহার করতে হবে । যেমন গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি
৫০০ গ্রাম, এমপি ৫০০ গ্রাম ইত্যাদি । তাহলে দেখবেন পুঁইশাক সুন্দর তরতাজা
হয়ে উঠবে ।
সার প্রয়োগের নিয়মাবলী
জমিতে সার প্রয়োগের কিছু নিয়মাবলী রয়েছে । সেই নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে সার
প্রদান করতে হবে । ইউরিয়া ছাড়া সব সার জমির শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে
। তবে গোবর জমি তৈরির প্রথম দিকে প্রয়োগ করা উত্তম । তাহলে মাটির সাথে
ভালোভাবে মিশে যায় । প্রতিটি গাছ লাগানোর পরপরই গোবর দিয়ে লাগাতে হয় ।
আরও পড়ুনঃ পুঁইশাক কিভাবে পরিচর্যা করতে হয় ?
এতে করে গাছটি ভালোভাবে বসে । ইউরিয়া সার চারা গজানোর ৮ - ১০ দিন পর থেকে ১০ -
১২ দিন পরপর ২ - ৩ কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে । এতে
করে সার ভালোভাবে মাটির সাথে মিশে যাবে এবং মাটির গুনাগুন বৃদ্ধি করবে । এতে
করে ফসলের অনেক ভালো ফলন হবে ।
বীজ বপন ও চারা রোপণ
বীজ বপন করা ও চারা রোপন করার ও একটি নিয়ম কানুন রয়েছে । আপনি যদি সে নিয়ম
কানুন অনুযায়ী করেন, তাহলে আপনি কাঙ্খিত ফলাফল পাবেন । মার্চ-এপ্রিল মাসে
বৈশাখের বীজ বপন করতে হয় । বীজ ও শাখা কলম দিয়ে পুই এর চাষ করা যায় । তবে
বিচ দিয়ে চারা তৈরি করে এবং তা রোপণ করে চাষ করাই ভালো ।
পুইশাকের চারা ৬০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে শাড়ি করে ও শাড়িতে ৫০
সেন্টিমিটার দূরে দূরে রোপন করতে হবে । বর্ষার সময় পুইশাকের লতার কিছু অংশ
কেটে মাটিতে রোপন করা যায় । আপনি উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী বীজ বপন এবং চারা
রোপণ করতে পারেন । আপনি আপনার বসতবাড়িতে একটি গাছ লাগিয়েও চাষ করতে
পারেন, নিজের খাওয়ার জন্য ।
পরিচর্যা
শুধুমাত্র চারা রোপণ এবং বীজ বপন করে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না । সেই গাছকে
অনেক পরিচর্যা বা দেখাশোনা করতে হয় । তবেই আপনি একটি কাঙ্খিত ফল পাবেন । একটি
গাছ অনেক পরিচর্যা করার পর একটি ভালো ফসল দেয় । তাই কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়ার
জন্য আপনাকে অনেক পরিশ্রম এবং কষ্ট করতে হবে ।
নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে । খরার সময় নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে
। সেজের পর নিড়ানি দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে দিতে হবে । জমিতে যাতে পানি না
জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে । গাছে ফল না আসা পর্যন্ত আপনাকে অনেক ধরনের
পরিশ্রম করতে হয় । তবেই আপনি আপনার মন মত একটি ফসল পাবেন ।
পোকামাকড়
শুধুমাত্র পুঁইশাক নয়, প্রতিটি গাছে অনেক পোকামাকড় হয়ে থাকে । এক একটি গাছে
একেক রকমের পোকামাকড় থাকে । এই পোকামাকর গাছপালার অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে থাকে ।
তাই বিশেষ করে যখন ফল ধরার সময় হয় তখন এই পোকামাকড় অনেক ক্ষতি করে । তাই এই
ক্ষতি থেকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কীটনাশক বা ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে করে এই
পোকামাকড় গাছের কোন ক্ষতি না করতে পারে ।
পুইশাকের ক্ষতিকর পোকার মধ্যে একটি হচ্ছে শুয়োপোকা । এই পোকা গাছের
পাতা, কচি ডগা খেয়ে ক্ষতি করে থাকে । তাই এই পোকার হাত থেকে রক্ষার জন্য
বিভিন্ন ওষুধ গাছে প্রয়োগ করতে হবে বা কীটনাশক ছিটাতে হবে । তবেই আপনি এই
প্রকার হাত থেকে মুক্তি পাবেন বা গাছকে রক্ষা করতে পারবেন ।
ফসল সংগ্রহ ও ফলন
পুইশাকের ডগা লম্বা হতে শুরু করলেই ডগা কেটে সংগ্রহ করতে হবে । এভাবে ডগা কেটে
সংগ্রহ করলে নতুন ডগা গজাবে । এভাবে নতুন ডগা কয়েকবার কেটে ফসল সংগ্রহ করা
যায় । ভালোভাবে চাষ করলে প্রতি শতকে ১৩০ থেকে ১৫০ কেজি পুঁইশাকের ফলন পাওয়া
যায় । আপনি যত কাটবেন তত ডালপালা বের হতে থাকবে এবং ফলন বাড়তে থাকবে ।
তাই আপনি এভাবে ফসল সংগ্রহ করতে পারেন এবং ফলন বৃদ্ধি করতে পারেন । পুঁইশাক
গাছের ফসল এভাবে সংগ্রহ করতে হয় । আপনি যদি বসত বাড়িতে পুঁইশাক চাষ করেন
বা ছাদের উপরে চাষ করেন ঠিক একই ভাবে ডগা কেটে কেটে ফসল সংগ্রহ করতে পারেন ।
আসলে এভাবেই পুঁইশাকের ফসল সংগ্রহ করা হয় ।
উপসংহার
আপনি যদি পুঁইশাক চাষ করতে চান তাহলে, উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে পুঁইশাক
চাষ করতে হবে । তাই এইভাবে যদি আপনি পুঁইশাক চাষ করেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে একদিন
কাঙ্খিত ফলাফল পাবেন । বর্তমানে পুঁইশাকের অনেক চাহিদা রয়েছে । তাই আপনি
যদি পুঁইশাক চাষ করেন তাহলে ভালো লাভ করতে পারবেন ।
তাই আপনি চাইলে শহরে এবং গ্রামে যে কোন জায়গায় পুঁইশাকের চাষ করতে পারেন ।
আর্টিকেলটা কেমন হয়েছে কমেন্টে জানাবেন । কোন ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন । সবাই
ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন । সবাইকে অনেক ধন্যবাদ ।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url